প্রাণটা কেড়ে নিয়েছিল খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে

লেখাটা পড়বেন, পারলে নিজের বিবেক কে প্রশ্ন করবেন।

| এ কেমন অতিথি আপ্যায়ন |


-কল্যাণ অধিকারী


মাঝেমধ্যে অতিথিও বাড়িতে আসে, আমিও এসেছিলাম জঙ্গলমহলে তাই বলে এইভাবে মারলে আমায়। ক'দিনে খেয়েছি তো শুধু বনো শুয়োর আর খরগোস আর দেখেছি তোমাদের শাল পলাশের জঙ্গল, তাও আমার শরীরকে ছিন্নভিন্ন করে দিলে।

আমার রক্তে পেয়েছ কি তোমরা খুঁজে মানুষের হাড় ? পেয়েছ কোন গ্রাম্য মেয়ের চুল তবুও আমার শরীরকে তীর ধনুক দিয়ে খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে মারলে। কেড়ে নিলে জীবন থেকে প্রাণশক্তি। আর কেউ বলবে না জঙ্গলমহলে রয়েছে বাঘ।

আমাকে খুঁজবে না ক্যামেরা হাতে ফটো শিকারির দল। বাড়ির গবাদি পশুকে রাতের অন্ধকারে দেখতে উঠবে না গৃহকর্তা। একবার খুঁজে পাবার জন্য উড়বে না সরকারি ড্রোন। বনকর্তা আনবে না সুন্দরবন থেকে বাঘ খোঁজা কুকুর।

সেদিন আমার খুব ভয় করেছিল যখন প্রথম দিন এখানে আসি। গল্প শুনেছিলাম এখানে নাকি একসময় মাওবাদীরা থাকতো কই ক'দিনে তো দেখলাম না ওদের। শুধু দেখা মিলল ওদের থেকেও ভয়ঙ্কর শিকারিদের। যাদের তীর বল্লমের ফলায় থাকে বিষাক্ত বিষ। যারা আমার আগে শয়ে শয়ে পশুকে হত্যা করে তাদের সন্তানদের করেছে বাপ-মা হারা।

সত্যি বলতে কি এখানে যখন আসি ভেবেছিলাম এখানে রয়েছে শাল সেগুনের মাঝে ভালোবাসার বসন্ত। কিন্তু চৈত্রেই হারিয়ে ফেললাম নিজেকে। দিনদিন জঙ্গল জুড়ে বেদনার সুর শুনতে শুরু করি। অতিষ্ঠ হয়ে ওঠে মন। নির্যাতিত পশুদের কান্নায় সর্বদা ভারি এখানের জঙ্গলের বাতাস।

তোমরা আমাদের মেরে কাঁধে ঝুলিয়ে নিয়ে যাও বাড়িতে। তোমাদের টানাটানির সংসারে পশুকে মেরে খেয়েই সন্তান লালন পালন করো। আর পশুদের সন্তানদের করো বাপ-মা হারা। মায়ের চোখে ছেলেবেলা বুঝে নেবার আগেই মাকে কেড়ে নাও। এ কেমন বিচার তোমাদের বলতে পারো।

আমরা পশু সমাজে বাবাকে পাপা বলি না শুধু সন্তানের পিতা বলেই জানি যে সন্তানদের জন্য লড়াই করতে জানে। বাপ-মা হারা চার-পাঁচ ভাই বোনের কিভাবে জীবন বাঁচবে বলতে পারো ? আমাদের হাতে অর্থ থাকে না, থাকে না ছাদওয়ালা ঘর তবুও গাছের নিচে একটু বাঁচার জন্য ঠকঠক করতে থাকে চার-পাঁচ ভাইবোন।

আমাদের পশু সমাজে বিচার বড্ড সহজ এখানে বাঁচার জন্য লড়াই চালাতে হয় শেষ নিঃশ্বাস অবধি। আর তোমাদের পেটের লড়াই চালাতে হয় অতিথিকেও মেরে ফেলা অবধি।

সত্যি আজ হাসছে জঙ্গলমহল। আমার শরীরে তীর-বল্লমের আঘাত মৃত্যু এগিয়ে আসছে দেখেও হ্যাঁ তবুও আমি হাসছি। দেখো আমার দুটি চোখ চেয়ে আছে। কি বলছ চোখের কোন দিয়ে গড়িয়ে আসা জল ! ওটা তো তোমাদের অতিথি আপ্যায়ন দেখে।

এসেছিলাম শত মাইল পার করে পায়ে হেঁটে, ফিরব এবার সরকারি আতিথিয়তায় মাটির গর্তে শায়িত হয়ে।

©---- কল্যাণ অধিকারী 

Comments

Popular posts from this blog

গল্প যখন সত্যি তৃতীয় পর্ব

শরৎচন্দ্রের বাড়ি একদিনে'র গন্তব্য

শান্ত দামোদর, পাখিদের কলকাকলি, বাড়তি পাওনা ভারতচন্দ্রের কাব্যতথ্য