এক জীবন্ত কাহিনী সময় থাকলে পড়বেন
| তোমার প্রশ্ন আমার শরীরে গাঁথা |
-কল্যাণ অধিকারীআচ্ছা বলতে পারো মা আর কতবার আমাকে সাজুগুজু করে বসতে হবে ! তোমাদের কাছে কি আমি এতটাই বোঝা হয়ে গেছি। দাদা-বাবা শেষে মা তুমিও সেই একটার পর একটা ছেলের সামনে বসতে জোরাজুরি করছো। আমার যোগত্যা তো ওদের কাছে কোন কিছু নয় আমি কটা রিলেশনে ছিলাম, আমার গায়ের রং, আমার শারীরিক গঠন ওদের চোখে পরে।
হঠাতি মৌমিতার ঘুমটা ভেঙে গেল। মাথার কাছে জোরে ঘুরতে থাকা পাখাটা সাত-আট বছর আগে নিয়ে চলে গিয়েছিল। গ্লাসে রাখা জলটা খেয়ে স্কুলে পড়াশোনার সময়কার কথাগুলো নাড়াচারা করিয়ে দিল। মধ্যবিত্ত ঘরের মেয়ে বাবা চাকরি করে বেসরকারি সংস্থায়। ছোট থেকেই দুই বোনের একসাথে বড় হওয়া। বোন হলেও ও ছিল আমার বন্ধু।
স্কুলে যাবার সময় অনেকটা পথ যেতে হতো। ক'জন বন্ধু মিলেই মাথার বেণী দোলাতে দোলাতে পৌঁছে যেতাম বড় রাস্তার ধারে এলাকার এক দাদুর নামে স্কুলটিতে। টিফিনের সময় স্কুলের বারান্দায় দাঁড়িয়ে বাস-লরি দেখতে থাকতাম। আর ভাবতাম আমিও যদি ওই রকম বাসে করে সারাদিন ঘুরতে পারতাম ! চোখ ঝপসা হয়ে আসতো ঠিক সেইসময় ঘন্টা বেজে উঠতেই ফিরে পেতাম সঙ্গত।
বিছানায় রাখা ফোনটায় টিং টিং করে ম্যাসেজ ঢুকল। প্যাটার্ন খুলতেই বোনের মুখটা ভেসে উঠল। মৌপিতার ডিপিটা খুব সুন্দর লাগছে। সেদিন বাড়িতে অনেক মানুষ এসেছে। ওঁরা নাকি পাকা দেখা করে বিয়ের দিন ঠিক করে যাবে। খুশিতে ডগমগ সকলে। শুধু আমি ছিলাম না খুশিতে। বোনকে বলেছিলাম জানিস ওদের প্রশ্ন আর অবাক চাউনি দেখে আমিও ক্লান্ত হয়ে গেছি।
প্রতিদিনের সঙ্গী ডাইরিটাকে ইচ্ছে করছিল সেদিনকেই পুড়িয়ে দিতে। গ্রামের মেয়ে কারোর দিকে তাকিয়ে কথা বলার স্পর্ধা পেত্তাম না। তবুও ইটের রাস্তার দিকে তাকিয়ে যেতে সব সময় পারতাম না। মুখ তুললেই কোন না কোন ছেলের চোখাচোখি হয়ে যেত। বাঁকা ঈশারা আসত সবসময়। শরীরের সামনের দিকে নজর দিত ওরা। তবুও ওড়নাটা টেনে দিয়ে এগিয়ে যেতাম।
সেদিন রাস্তার মাঝে একটা বাইক এসে দাঁড়াল। পাশ কাটিয়ে যাবার চেষ্টা করতেই ওড়নাটা টেনে ধরলো। বলে উঠল সে নাকি আমায় বিয়ে করতে চায়। না বললে পরের দিন হাতটা সামনের ওইখানে পরবে। গলাটা শুকিয়ে গিয়েছিল। কোনক্রমে বাড়ি ফিরে দু গ্লাস জল ঢকঢক করে খেয়ে দেওয়ালে গা ঠেকিয়ে বসে পড়েছিলাম। তারপর থেকে বোনের সাথেই স্কুলে যেতাম।
ছেলের পক্ষ থেকে দেখতে আসত আর একটা করে ছবি চাইত। ওদের নাকি বাড়ির সকলে দেখাবার আছে। আচ্ছা এখানে দেখে গিয়ে মনস্থির করা যায় না। এমনিতেই বাড়িতে একটু সাজুগুজু করলে হাজারো প্রশ্ন এত সাজার কি আছে। ওড়না গলায় কেন উঠেছে। বিকেল বেলায় ঘুরতে যাওয়ার কি দরকার। জিজ্ঞাসা করতে ইচ্ছে করে গরীবের ঘরের মেয়ের বিয়েতে জোরেজোরে বক্স বাজাবার অধিকার নেই।
বিয়ে হয়েছে তবে স্বামীর ইচ্ছা স্ত্রী চাকুরীজীবী হোক। এত দেখে-শুনে-ঘুরে তবেই তো বিয়ে করলেন তারপরও মনে হল না চাকুরীজীবী আপনার পছন্দ ছিল। সমাজের চোখে নাকি স্ট্যাটাস দেখায় না। অথচ ওই ডাইরির পাতায় কত লিখেছি মনের কথা প্রাণের মানুষটির কথা। আমাদের মতো ঘরের মেয়েরা প্রেম করলে কলঙ্কিনীর খাতায় নাম চলে যায়। আর দেখাশোনা করে স্বামীর হাত ধরে নতুন মায়ের আঁচল পাবার পরেই শুরু হয়ে যায় কথিত সিরিয়ালের রূপান্তরিত রূপ।
©---- কল্যাণ অধিকারী
চিত্র গুগল।

Comments
Post a Comment