|কত রাত জেগে ঘুম পারিয়েছ বন্দুকের নলের গান গেয়ে|


বাঘিনি এনকাউন্টার ! 

-কল্যাণ অধিকারী
ইয়াভাতমাল জঙ্গল, মহারাষ্ট্র। বাস করতো এক দাম্ভিক মা। বয়স পাঁচ। স্বামী এবং সন্তানদের নিয়ে বেশ মেজাজে ছিল ঘরসংসার। তবে জঙ্গলজুড়ে হত্যাকান্ড চালানোর দোষ চেপেছিল ওর মাথায়। সর্বহারাদের দাবি মেনে শুরু বিচার ইত্যাদি। বিচারে বলা হয় ঘুম পাড়ানি গুলি মারবার। বশ না মানলে রাবার গুলি। কিন্তু সবকিছুর উর্দ্ধে গিয়ে দুই সন্তান মায়ের 'মৃত্যুদণ্ড' কার্যকর করে দিয়েছে এক শার্প শ্যুটার। আর মাতৃত্ব হারা দুই সন্তানের বুকে গভীর শুন্যতা সৃষ্টি করেছে।
'অবনী' বাড়ি আছো
দুয়ার এঁটে ঘুমিয়ে আছে পাড়া।
কেবল শুনি রাতের কড়ানাড়া
‘অবনী' বাড়ি আছো ?
বেশ সুশ্রী চেহারার সেই মা আসলে বাঘিনি। নাম 'অবনী'। তবে পোশাকি টি-১ নামেই এখন পরিচিত। জঙ্গল জুড়ে স্বামী সন্তানদের নিয়ে রাজ করায় ও প্রজাতির অন্য কেউ না থাকায় খাওয়া দাওয়ার অভাব ছিল না। সুঠাম ও দর্শনধারী শরীর এবং গুণ বিচারি দেখে প্রেমে পড়বে না এমন কোন রাজপুত্র নেই। কিন্তু জঙ্গলে যে লুকিয়ে ছিল না অন্য পুরুষ বাঘ। স্বামীর সঙ্গে সঙ্গম শেষে নিজের রূপের ডালি ছড়িয়ে দিত প্রকৃতির মাঝে পাতার ফাঁকে, গাছের ভিড় ঠেলে সমগ্র জঙ্গলে। এভাবেই চলতে থাকে ভোর-দুপুর-রাত।
তারপর,,,,,
দু পায়ে বিদ্যেধর মানুষ নামক জন্তুদের লোভ লালসালু চোখ ইয়াভাতমাল জঙ্গলে পড়তে শুরু করে। কয়েক হাজার বর্গ কিলোমিটার জঙ্গলের পাহারায় রয়েছে একটি বাঘিনি ও তার স্বামী-সন্তান। এইটুকু ছিল মাত্র প্রতিরোধ ? ওটাকে সালটে দিলেই গোটা জঙ্গল লোভী মনুষত্বের। শুরু গেম প্ল্যান ওয়ান। খাবারের ফাঁদ পেতে মেরে ফেলার সহজ উপায়। যার থাবায় জঙ্গলের বিভিন্ন প্রজাতির ঠিকুজি কুষ্ঠি মাংসের লোভ তাকে দেখানো ? হিংস্রতার আঁচড়ে রক্তাক্ত হয়ে যায় মনুষত্ব। হার মানে গেম প্ল্যান ওয়ান।
শুরু নিখুঁত লক্ষ্যে পৌঁছাতে বুদ্ধির খোঁজ। শক্তিশালী বাঘিনির পরিচয় ছড়িয়ে দিয়েছিল মানুষখেকো! একের পর এক মানুষকে বাঘে টেনে নিয়ে যাওয়ার খবরে গোনাগুনতি শুরু হয়ে যায় বন দপ্তরে। সর্বহারা হতে শুরু করে ওই এলাকার মানুষ। বাঘিনির মাথায় ঝুলছে ১৩ টি মৃত্যুর অপবাদ। শুরু আদালত বসা ইত্যাদি। রায় মিলতেই অভিযানের চিত্রনাট্য সাজানো। যে ভাবেই হোক ওকে ধরবার থেকে মৃত্যু নিশ্চিত করাটাই যেন কর্তব্যে পড়েছিল বেশি!
এখানে মেঘ গাভীর মতো চরে
পরাঙ্মুখ সবুজ নালিঘাস
দুয়ার চেপে ধরে–
‘অবনী বাড়ি আছো?
না, শক্তি চট্টোপাধ্যায় মহাশয় অবনী বাড়ি তে নেই। ওর বিরুদ্ধে এনকাউন্টার গেম খেলা হয়েছে। শার্প শ্যুটারীর নিখুঁত নিশানা মহারাষ্ট্র জেলার পনঢারকাওড়া এলাকার ১৩ জনের স্বজনদের কাছে খুশি এনে দিয়েছে। যশন মানাচ্ছে এলাকাবাসী। মাস দেড়েকের লড়াইয়ের শেষে প্রশাসন স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলছে। এককথায় এনকাউন্টার করা হয়েছে চার পেয়ে স্ত্রী বাঘিনি কে। ওই বিতর্কিত শার্প শ্যুটার কে তদন্তের সামনে বসানো হোক। ও সত্যি কথা বলবার ফাঁকে একটা দারুণ গল্প ফেঁদেছে তা কিন্তু সকলেই বুঝতে পারছে। দেশের মধ্যে যে ভাবে বাঘের সংখ্যা কমছে একসময় গুগল সার্চ করে একটা প্রজন্মকে বাঘ সম্পর্কে ছবি দেখাতে হবার কথা বলছে পশু প্রেমীরা। সেখানে একটি জলজ্যান্ত বাঘকে এভাবে মেরে দেওয়া হবে ?
বাঘিনি এখন ঘুমন্ত। খুঁজবে না ক্যামেরা হাতে শিকারির দল। একবার খুঁজে পাবার জন্য উড়বে না সরকারি ড্রোন। বনকর্তা আনবে না বাঘ খোঁজা কুকুর। জঙ্গলে স্মৃতি আটকে রয়েছে বাঘিনির রূপের ছটা। পশু সমাজে বিচার বড্ড সহজ এখানে বাঁচার জন্য লড়াই চালাতে হয় শেষ নিঃশ্বাস অবধি। হ্যাঁ আপনারা হত্যা করেছেন একজন পিশাচের বন্দুকের গুলিতে। বলতে লজ্জা নেই কতজন খুন হয়েছে বাঘিনির থাবায়, তার পেটে মানুষের মাংসের টুকরো রয়েছে কি, হিসাব করে দেখুক প্রশাসন। করা হোক একাধিক পরীক্ষা। বাঘিনি ও মানুষ খাবার গল্পে মোটা অর্থের লেনদেন হয়নি তো ?
শেষে কবিকে স্মরণ করে বলি,
হেমন্তের অরণ্যে আমি পোস্টম্যান ঘুরতে দেখেছি অনেক,
তাদের হলুদ ঝুলি ভরে গিয়েছিলো ঘাসে আবিল ভেড়ার পেটের মতন।
কত কালের পুরোনো নতুন চিঠি কুড়িয়ে পেয়েছে
এই অরণ্যের পোস্টম্যানগুলি।
©-কল্যাণ অধিকারী

প্রতীকি চিত্র গুগল থেকে

Comments

Popular posts from this blog

গল্প যখন সত্যি তৃতীয় পর্ব

শরৎচন্দ্রের বাড়ি একদিনে'র গন্তব্য

শান্ত দামোদর, পাখিদের কলকাকলি, বাড়তি পাওনা ভারতচন্দ্রের কাব্যতথ্য